HomeTop Newsলাল পতাকার অন্তিম প্রহর, বাংলায় বামেদের ভবিষ্যৎ কি তবে শূন্য?

লাল পতাকার অন্তিম প্রহর, বাংলায় বামেদের ভবিষ্যৎ কি তবে শূন্য?

বাংলার রাজনীতিতে সাড়ে তিন দশক শাসন করে যে সিপিএম একসময় ক্ষমতার সমার্থক হয়ে উঠেছিল, আজ সেই দলের নেতৃত্বাধীন বাম শিবির নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের দুই উপনির্বাচন মিলিয়েও দশ হাজার ভোটারের আস্থা অর্জন করতে পারল না

কণাদ দাশগুপ্ত : বাংলার রাজনীতিতে সাড়ে তিন দশক শাসন করে যে সিপিএম একসময় ক্ষমতার সমার্থক হয়ে উঠেছিল, আজ সেই দলের নেতৃত্বাধীন বাম শিবির নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের দুই উপনির্বাচন মিলিয়েও দশ হাজার ভোটারের আস্থা অর্জন করতে পারল না। এ শুধু পরাজয় নয়, রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারানোর ভয়াবহ সংকেত। যে দলের একসময় গ্রামবাংলার অলিগলি থেকে শ্রমিক মহল্লা পর্যন্ত ছিল সাংগঠনিক আধিপত্য, আজ ভোটের বাক্সে তাদের উপস্থিতি নামমাত্র। অথচ এই বিপর্যয়ের দায় স্বীকার করে আত্মসমালোচনার পথে হাঁটার বদলে বাম নেতৃত্ব যদি এখনও প্রধান বিরোধী দল হওয়ার স্বপ্ন দেখায়, তবে তা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কী?

নন্দীগ্রামে সিপিআই প্রার্থী শান্তিগোপাল গিরি পেয়েছেন ৫,৭৭৯ ভোট। রেজিনগরে সিপিএমের মহম্মদ সঈদের প্রাপ্তি মাত্র ২,৫২২। দুই কেন্দ্রে বামেদের মোট ভোট ৮,৩০১। কিন্তু আসল প্রশ্ন এই সংখ্যার চেয়েও গভীর– কেন বামেদের আর রাজনৈতিক বিকল্প বলে মনে করছেন না ভোটারেরা? কেন একদা সংগঠননির্ভর এই দল মানুষের ক্ষোভকে নিজেদের পক্ষে টানতে ব্যর্থ? কেন কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার মতো প্রশ্নে বামেদের বক্তব্য ভোটারের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলতে পারছে না?

এই ব্যর্থতার কেন্দ্রবিন্দুতে সিপিএমের নেতৃত্ব। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ক্ষয়, জনসংযোগের অভাব এবং বাস্তবের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক কৌশলের দায় কোনওভাবেই এড়ানো যায় না। তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলেই তা বামেদের ভোটে পরিণত হবে—এই সরল অঙ্ক যে ভুল, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। একই ভাবে বিজেপির বিরোধিতা করলেই নিজেদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, এমন ধারণাও বাস্তববিবর্জিত। বিরোধিতা করা আর বিকল্প হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। বাম নেতৃত্ব এই মৌলিক সত্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই তাদের রাজনৈতিক পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ, সিপিএম এখনও অতীতের সাংগঠনিক ঐতিহ্যকে বর্তমানের শক্তি বলে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু অতীতের জমি বর্তমানের ভোট নিশ্চিত করে না। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ, কর্মসংস্থান নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি, স্থানীয় স্তরে নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা এবং মানুষের সমস্যায় ধারাবাহিক উপস্থিতি—এসবের বিকল্প কোনও স্লোগান হতে পারে না। নেতৃত্বের ব্যর্থতার দায় কর্মী ও সমর্থকদের উপর চাপিয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। রাজনৈতিক দিশা ঠিক করা, সংগঠনকে পুনর্গঠন করা এবং মানুষের আস্থা ফেরানোর দায়িত্ব নেতৃত্বেরই।

নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ফল তাই বামেদের সামনে কঠিন বাস্তব তুলে ধরেছে। বাংলায় বামেদের ভবিষ্যৎ আজ আর স্বতঃসিদ্ধ নয়; বরং ক্রমশ অনিশ্চিত। আত্মসমালোচনা, নেতৃত্বের দায় স্বীকার এবং রাজনৈতিক পুনর্গঠন ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানোর পথ নেই। তা না হলে লাল পতাকা বাংলার রাজনীতিতে একদিনের ক্ষমতাশালী অতীতের স্মারক হয়েই থেকে যাবে—ভবিষ্যতের শক্তি হয়ে উঠতে পারবে না।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments