ওয়েব ডেস্ক: দুর্গোৎসব কেন বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব? তার উত্তর শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসে নয়, বাঙালির কৃষিজীবন, প্রকৃতিচেতনা, খাদ্যসংস্কৃতি এবং ঘরের মেয়েকে ফিরে পাওয়ার চিরন্তন আবেগে। বারো মাসে তেরো পার্বণের বাংলায় দুর্গাপুজোই এমন এক উৎসব, যেখানে শাস্ত্রের দেবী মিশে যান মাটির মানুষের জীবনে, আর আরাধনার আড়ালে ধরা দেয় একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়।
পুরাণে দেবী দুর্গার শাকম্ভরী ও শতাক্ষী রূপ প্রকৃতি, জল ও শস্যের সঙ্গে মাতৃশক্তির সম্পর্ক তুলে ধরে। দেবীভাগবত-সহ পুরাণসাহিত্যে শাকম্ভরী জীবজগতের অন্নসংকট মোচনকারিণী; শতাক্ষী রূপের সঙ্গে যুক্ত দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টির অবসানের আখ্যান। কৃষিনির্ভর সমাজে এই পৌরাণিক কল্পনার তাৎপর্য গভীর—প্রকৃতির দানই জীবনধারণের ভিত্তি।
এই ভাবনার সাংস্কৃতিক প্রতিফলন নবপত্রিকা পূজায়। কলাগাছ-সহ নয়টি উদ্ভিদের সমন্বয়ে গঠিত নবপত্রিকা দুর্গাপুজোয় দেবীর প্রতীকী রূপ হিসেবে পূজিত হয়। কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানের মতো উদ্ভিদ এর উপাদান। প্রচলিত লোকাচারে নবপত্রিকাকে কলাবউ বলা হলেও, তাকে নিছক গণেশের স্ত্রী হিসেবে দেখলে এই আচারটির বৃহত্তর তাৎপর্য আড়ালে থেকে যায়। নবপত্রিকা প্রকৃতির প্রাচুর্য, শস্যের সম্ভাবনা এবং উদ্ভিদজগতের প্রতি মানুষের নির্ভরতার প্রতীক। এর মধ্যে কৃষিজীবী বাংলার প্রকৃতিবন্দনা ও ফসলের প্রতি কৃতজ্ঞতার সাংস্কৃতিক স্মৃতি বহমান।
পুজোর ভোগেও সেই কৃষিসংস্কৃতির ছাপ। চাল, শাকসবজি, ফলমূল ও মিষ্টান্নের নিবেদন ধর্মাচারের পাশাপাশি বাঙালির খাদ্যঐতিহ্যকে ধারণ করে। অন্য দিকে, উমার বাপের বাড়ি ফেরার লোককল্পনা দুর্গোৎসবকে দিয়েছে একান্ত পারিবারিক আবেগ। আগমনের আনন্দ, বিদায়ের বিষাদ আর আবার ফিরে আসার প্রতীক্ষা—সব মিলিয়ে দেবী হয়ে ওঠেন ঘরের মেয়ে।
এইখানেই দুর্গোৎসবের অনন্যতা। দেবী এখানে একই সঙ্গে মহিষাসুরমর্দিনী, শস্যদাত্রী এবং স্নেহের কন্যা। বিসর্জনের মুহূর্তে তাই শুধু প্রতিমা বিদায় নেয় না, মনখারাপের মেঘে ঢেকে যায় বাঙালির ঘরও। তবু বুকের মধ্যে জেগে থাকে এক অমোঘ আশ্বাস—‘আসছে বছর আবার হবে’। প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞতা, শিকড়ের প্রতি টান এবং আপনজনকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—এই চিরন্তন বন্ধনেই দুর্গোৎসব যুগে যুগে বাঙালির প্রাণের শ্রেষ্ঠ উৎসব হয়ে থাকবে।




