কণাদ দাশগুপ্ত
কালীঘাটের বাড়িতে মা কালীর পুজো। প্রতি বছরের মতো এ বারও পুজোর আয়োজন করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এবারের কালীপুজোর আবহে একটা বড় পার্থক্য। প্রায় ১৫ বছর পর এই প্রথম রাজ্যের ক্ষমতায় নেই মমতা। বদলে গিয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণ, বদলেছে ক্ষমতার কেন্দ্রও। তাই কালীঘাটের বাড়ির পুজোয় এ বার শুধু ভক্তি আর ধর্মীয় আবহ নয়, নজর থাকবে আরও একটি বিষয়ের দিকে—গত বছর পর্যন্ত যাঁদের উপস্থিতিতে বাড়ি সরগরম থাকত, সেই পরিচিত মুখগুলির কতজন এবার হাজির হন?
গত কয়েক বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির কালীপুজো ছিল তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক এবং ঘনিষ্ঠ মহলের অনেকের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার অন্যতম জায়গা। পুজোয় যাওয়া মানেই শুধু মায়ের কাছে প্রার্থনা নয়, দিদির সামনে নিজের আনুগত্যের প্রমাণ দেওয়ারও সুযোগ। কেউ সপরিবারে হাজির হতেন, কেউ আবার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে বসে থাকার জন্য বিশেষ তৎপরতা দেখাতেন। কে কতটা কাছের, কে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কে কত কাজ করছেন—সেই বার্তা দেওয়ার যেন অলিখিত প্রতিযোগিতা চলত।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হোম-যজ্ঞের সময় ছবির ফ্রেমে থাকার জন্য ঠেলাঠেলি, সামনে বসার জন্য ব্যস্ততা, নেত্রীর নজরে পড়ার চেষ্টা—সবই ছিল সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচিত দৃশ্য। ক্ষমতার অলিন্দে যাঁদের যাতায়াত ছিল, তাঁদের অনেকের কাছেই কালীঘাটের বাড়ির পুজো হয়ে উঠেছিল সম্পর্ক রক্ষা এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব জাহির করার মঞ্চ।
কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই পরিচিত মুখগুলির অবস্থান কী হবে? যাঁরা একসময় দিদির বাড়িতে নিয়মিত হাজিরা দিতেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এখন রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছেন। কেউ দূরত্ব তৈরি করেছেন, কারও বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা ও গদ্দারির অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের কি এবারও দেখা যাবে কালীঘাটের বাড়িতে? নাকি ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া নেত্রীর বাড়ির পুজোয় উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তাঁদের কাছে ফুরিয়েছে?
প্রশ্নটা আরও বড়। এতদিনের ঘনিষ্ঠতা কি নিছক রাজনৈতিক সুবিধার অঙ্ক ছিল? ক্ষমতায় থাকার সময় যাঁরা সপরিবারে হাজির হয়ে ঘনিষ্ঠতার প্রদর্শন করতেন, ক্ষমতা হারানোর পর তাঁদের সেই সম্পর্কের দায়বদ্ধতা কতটা থাকবে? রাজনৈতিক আনুগত্য কি কেবল ক্ষমতার চেয়ারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়? লজ্জা, বিবেক কিংবা পুরনো সম্পর্কের কোনও মূল্য কি তাঁদের কাছে অবশিষ্ট রয়েছে?
অবশ্য মমতার কাছে কালীপুজো ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের কাছে এবারের পুজো হয়ে উঠতে পারে এক অন্য পরীক্ষা। কে এলেন, কে এলেন না, কারা পুরনো সম্পর্ক বজায় রাখলেন, আর কারা দূরত্ব বেছে নিলেন—কালীঘাটের বাড়ির পুজোয় সেই ছবিই হয়তো আগামী দিনের তৃণমূল রাজনীতির অনেক অজানা সমীকরণ সামনে নিয়ে আসবে।




