কণাদ দাশগুপ্ত
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। দিল্লির ১ সফদরজং রোডের সকালটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশের দফতরের দিকে এগোচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। পরনে শাড়ি, মুখে স্বাভাবিক দৃঢ়তা। হয়তো মনে ছিল দিনের কাজের হিসাব। হয়তো বাড়ি ফিরে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে দেখা করার কোনও ছোট্ট পরিকল্পনাও। কিন্তু সেই সকাল যে আর কোনও দিন পূর্ণ হবে না, তা কে জানত! নিজেরই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই দেহরক্ষীর বন্দুক থেকে ছুটে এল একের পর এক গুলি। মুহূর্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। যে মানুষটির নিরাপত্তার জন্য চারপাশে এত আয়োজন, তাঁর জীবনই শেষ হয়ে গেল নিজের বাড়ির চৌহদ্দিতে!
সেই ভয়াবহ মুহূর্তের স্মৃতি আজও শিউরে ওঠার মতো। গুলিবিদ্ধ ইন্দিরাকে নিয়ে যাওয়া হল দিল্লির AIIMS-এ। চিকিৎসক পি বেণুগোপাল পরে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকা ইন্দিরার শরীর তখন নিজের রক্তেই সম্পূর্ণ ভেজা। মুখ বিবর্ণ, পেট থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণ। চিকিৎসকেরা শাড়ি সরাতেই তার ভাঁজ থেকে ঝরে পড়তে শুরু করল একের পর এক গুলি। যেন মৃত্যুর নির্মম সাক্ষ্য ছড়িয়ে পড়ল হাসপাতালের মেঝেতে।
মোট ৩৩টি গুলি ছোড়া হয়েছিল। তার মধ্যে ৩০টি বিদ্ধ করেছিল ইন্দিরার শরীর। ২৩টি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়, সাতটি থেকে যায় ভিতরে। শুরু হল জীবন বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচার। রক্তে ভিজে যাওয়ায় তিন বার পোশাক বদলাতে হয়েছিল চিকিৎসককে। তবু ফিরিয়ে আনা গেল না তাঁকে। দুপুর ২টো ২৩ মিনিটে শেষ হল সমস্ত চেষ্টা।
চিকিৎসক বেণুগোপালের স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছিল আরও একটি অসহনীয় মুহূর্ত। মৃত্যুসংবাদ জানাতে হবে পরিবারের মানুষদের। অপেক্ষা ছিল ছেলে রাজীব গান্ধীর। তিনি ফিরে এসে মায়ের নিথর শরীরের সামনে দাঁড়ালেন। শোক সামলানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু মায়ের মৃত্যু কি কখনও সামলানো যায়?
সেদিন একটি পরিবারের মাথার উপর থেকে সরে গিয়েছিল মায়ের ছায়া। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশের রাজনীতি। ইতিহাসের পাতায় থেকে গিয়েছিল রক্তমাখা এক সকাল, যে সকালের কান্না চার দশক পেরিয়েও যেন শুকোয়নি।
সেদিন শুধু এক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু হয়নি, ভারত হারিয়েছিল এক দৃপ্ত নেতৃত্বকে, এক আপসহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে। রাজনীতির মতপার্থক্য, ক্ষমতার হিসাব কিংবা ইতিহাসের বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন এমন এক নাম, যাঁর জীবন ও কর্ম ভারতের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে। তাঁর সাহস, দৃঢ়তা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং দেশের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। যে মানুষটি একদিন কোটি কোটি ভারতবাসীর কাছে শক্তি ও নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর জীবনের শেষ দৃশ্যটি ছিল এক অসহায় রক্তাক্ত শরীরের নিথর হয়ে পড়ে থাকা।
সময় বয়ে যায়, প্রজন্ম বদলায়, ইতিহাসের পাতা নতুন অধ্যায়ে ভরে ওঠে। কিন্তু ৩১ অক্টোবরের সেই রক্তস্নাত সকাল আজও মনে করিয়ে দেয়—ইন্দিরা গান্ধী শুধু একটি নাম নন, তিনি ভারতের ইতিহাসের এক অনিবার্য অধ্যায়।




