কণাদ দাশগুপ্ত
শহর যখন আলোর মালায় নিজেকে সাজায়, ঢাকের বোল যখন আকাশে আকাশে বিজয়ের ঘোষণা লেখে, তখন বাংলারই কিছু জনপদে নেমে আসে অমাবস্যা। জানলা বন্ধ হয়, দরজায় নামে কালো পর্দা, উৎসবের উল্লাস থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয় এক জনগোষ্ঠী। তাদের কাছে দুর্গাপুজো আনন্দের আরাধনা নয়, বহু প্রজন্মের বুকে জমে থাকা এক আদিম শোকের নাম। সেখানে দেবী নন, মহিষাসুরই স্মৃতির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত।
লোকবিশ্বাসে তিনি হুদুড় দুর্গা—বজ্রের মতো শক্তিধর এক অনার্য রাজা, প্রজাপালক, লৌহকার, স্বজাতির গৌরব। প্রচলিত পৌরাণিক আখ্যান যেখানে তাঁর মৃত্যুতে অশুভের বিনাশ দেখে, সেখানে অসুর জনজাতির স্মৃতিতে সেই মৃত্যু পরাজিত পূর্বপুরুষের আর্তনাদ। একই কাহিনির দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে দুই বিশ্বাস, দুই ইতিহাসবোধ—এক দিকে বিজয়ের শঙ্খধ্বনি, অন্য দিকে বিস্মৃতির দীর্ঘশ্বাস।
আলিপুরদুয়ারের অসুরপল্লি থেকে পুরুলিয়ার কাশীপুর, উত্তরবঙ্গের চা-বাগান থেকে ঝাড়খণ্ডের পাহাড়ি জনপদ—দুর্গোৎসবের দিনগুলিতে কোথাও নীরবতা, কোথাও শোকগাথা, কোথাও দাঁশাই নাচের বুকচেরা বিলাপ। পুরুষেরা নারীর বেশে, হাতে ভুয়াং, বুক চাপড়ে যেন খুঁজে ফেরেন হারানো রাজার ছায়া। তাঁদের কাছে মহিষাসুর কোনও শিংওয়ালা দানব নন; তিনি এমন এক পূর্বপুরুষ, যাঁর স্মৃতি মুছে গেলেও মুছে যায়নি উত্তরসূরিদের হৃদয় থেকে।
তবু সময়ের নদী এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। কোথাও নতুন প্রজন্ম পুরনো নিষেধের বেড়া পেরিয়ে দুর্গোৎসবে যোগ দিচ্ছে, কোথাও এখনও কালো কাপড়ে ঢেকে রাখা হচ্ছে উৎসবের আলো। এই দ্বৈততার মধ্যেই ধরা পড়ে বাংলার বহুস্বরের সমাজ।
কার বিশ্বাস সত্য, সেই চূড়ান্ত বিচারের চেয়েও জরুরি অন্য প্রশ্ন—বিজয়ীর মহাকাব্যে পরাজিতের কান্না কি শোনার অবকাশ আছে? কারণ, ইতিহাসের মুকুটে যতই সোনার ঝিলিক থাক, তার ছায়ায় চাপা পড়ে থাকা মানুষের স্মৃতিও ইতিহাসেরই উত্তরাধিকার।




