বরুণ চক্রবর্তী
কালীপুজো মানেই ভূত, ভূত মানেই অনেক গল্প। ‘ভূত যদি না থাকবে তবে কোথ্বেকে হয় ভূতের ভয়’, বলেছিলেন স্বয়ং সুকুমার রায়। এর পরে আর কথা চলে নাকি। সুতরাং ভূত আছেই। আর সেই ভূতের হাত থেকে বাঁচতে পারেননি কেউই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত হানাবাড়ি নিয়ে বাংলায় প্রথম গল্পটি লিখেছিলেন। নাম ছিল ক্ষুদিত পাষাণ। বঙ্কিমের পণ্ডিত অবশ্য অন্য ভূত মানতেন। তিনি ছাত্র ভোদার কান কামড়ে বুঝিয়ে ছিলেন ‘ভূ’ ধাতুর সঙ্গে ‘ত্ত’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নাকি ভূত হয়। পরশুরামের ভূষণ্ডীর মাঠের শিবু বুঝিয়ে ছিলেন বায়ুবীয় ভূতের কথা।
ভূত যাঁরা বিশ্বাস করেন না শরদিন্দু তাঁদের বলেছিলেন, হর্দম বা হাঁদা। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে অবশ্য তেনাদের খুবই সখ্যতা। তাঁর লেখায় সহগোত্রীয় না হয়েও ভূত আর মানুষ বড় বেশি কাছাকাছি, পাশাপশি। তাই গয়নার বাক্স আসলে ভূতের উপন্যাস হলেও আমরা তার ঠাওর পাই না। ঠিক যেমন শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা গুটিকয় ভূতের গল্প।
উনবিংশ শতকের শেষ দিকে পো অর ল্য ফ্যানু বিদেশে এক সিরিয়াস ভূতের গল্পের চলন আনেন। এর পর সাহিত্যে ভুতের গল্প লেখার কিছু নির্দিষ্ট ফরমুলা তৈরি হয়। বাংলায় সিরিয়াস ভূতের গল্প লেখার একটি ধারা তৈরি করেন রবীন্দ্রনাথ। মণিহার, নিশীথে বা মাস্টারমশাই লেখেন তিনি। তাঁর ছেড়ে যাওয়া ব্যাটন তুলে নেন হেমেন্দ্রকুমার রায়, দীনেন্দ্রকুমার রায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, পেমেন্দ্র মিত্র, নিহাররঞ্জন গুপ্তরা। হই হই করে চলতে থাকে বাংলায় সিরিয়াস ভূতের কাহিনী। তবে সাইকোলজিক্যাল ভূতের গল্পের রাজা ছিলেন বিভূতিভূষণ। আনমনে গল্প করতে করতে মেরুদণ্ডে শীতল হাওয়া বইয়ে দিতেন। অনেকটা সেই ধাঁচেই ভূতের গল্প লিখতেন সত্যজিৎ রায়, বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
লীলা মজুমদারের ভূতেরা অবশ্য বেশ মাই ডিয়ার। এর পাশেই থাকবেন সুধীন রায়, মনোজ সেনেরা। গল্পের গড়নে এঁরা দুজনেই হেমেন রায়ের উত্তরসূরী। সময় বদলেছে, বৌদ্ধিক গল্পের ভারে বাংলার আদি সরল ভূতের গল্পের ধারাটাই কেমন যেন বদলে গেছে। শুধু অশরীরী আত্মারাই নয়, একেবার জাগতিক নানা ভয় একদম শিরশিরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। ভূতেরা তাই এখন একটু ব্যাক ফুটে। তাই হ্যালুইন টাইপ অনুষ্ঠান করে তেনাদের লাইমলাইটে আনার চেষ্টা হচ্ছে। আমরা সবাই জানি ভূত আর যাই হোক মানুষের মত ভয়াবহ নয়।




